ডিম নিয়ে সাধারণ কিছু ভ্রান্ত ধারনা এবং কুসংস্কার
আমাদের সমাজে ডিম নিয়ে সেই প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন ধরনের ভ্রান্ত ধারনা এবং কুসংস্কার বিদ্যমান। জেনেই হোক বা না জেনেই হোক যথেষ্ট পুষ্টিগুণ থাকা স্বতে ও ডিম সম্পর্কে অনেকেরই নেতিবাচক ধারনা আছে।

ডিম খেলে কোলেস্টেরল বাড়ে, তাতে উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি থাকে, বর্তমানে এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এ ধারণা আসলে সত্যি নয়। বাদামি খোসার ডিম ভালো, গাঢ় হলুদ কুসুমের ডিম ভালো, ফার্ম এর চেয়ে দেশী মুরগীর ডিম ভালো, ডিম খেয়ে পরীক্ষার হলে গেলে শুন্য পাবে ইত্যকার ভ্রান্ত ধারনা এবং কুসংস্কার বিদ্যমান। আসুন জেনে নেই বিজ্ঞান ও গবেষণা কী বলে।
আমাদের সমাজে ডিম নিয়ে সেই প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন ধরনের ভ্রান্ত ধারনা এবং কুসংস্কার বিদ্যমান। জেনেই হোক বা না জেনেই হোক যথেষ্ট পুষ্টিগুণ থাকা স্বতে ও ডিম সম্পর্কে অনেকেরই নেতিবাচক ধারনা আছে। ডিম খেলে কোলেস্টেরল বাড়ে, তাতে উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি থাকে, বর্তমানে এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এ ধারণা আসলে সত্যি নয়। বাদামি খোসার ডিম ভালো, গাঢ় হলুদ কুসুমের ডিম ভালো, ফার্ম এর চেয়ে দেশী মুরগীর ডিম ভালো, ডিম খেয়ে পরীক্ষার হলে গেলে শুন্য পাবে ইত্যকার ভ্রান্ত ধারনা এবং কুসংস্কার বিদ্যমান। আসুন জেনে নেই বিজ্ঞান ও গবেষণা কী বলে।
ডিমের খোসার রং এবং ভ্রান্ত ধারনাঃ
বাদামি খোসার ডিম সাদা খোসার ডিম অপেক্ষা ভালো এ ব্যাপারে আমাদের অনেকেরই ভ্রান্ত ধারনা আছে।সাধারণ ভোক্তার মধ্যে অনেকেই মনে করেন, বাদামি খোসার ডিমে পুষ্টিগুণ সাদা খোসার ডিমের চেয়ে বেশি। তাই ভোক্তা হিসেবে বেশির ভাগ মানুষের পছন্দ বাদামি খোসার ডিম। সত্যিকার অর্থে ডিমের খোসার রঙের সঙ্গে এর ভেতরের পুষ্টিগুণের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ও অমূলক ধারণা। ডিমের খোসার রং কী হবে তা নির্ভর করে মূলত মুরগীর বংশগত সামর্থ্য, কোন ধরনের স্ট্রেইন এবং বয়স ও পিগমেন্ট নিঃসরণের উপর। এ প্রচলিত ভ্রান্ত ধারনার প্রভাব বাজারে ও লক্ষ্য করা যায়, সব সময় বাদামি খোসার ডিমের বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে সাদা খোসার ডিমের চেয়ে বেশি থাকে। তবে বাস্তব সত্য হলো, একই ওজনের বাদামি খোসার ডিম ও সাদা খোসার ডিমের মধ্যে পুষ্টিগত কোন পার্থক্য নেই। সুতরাং বেশী দামে একই পুষ্টিমানের বাদামী খোসার ডিম কিনে খাওয়া অনেকটাই বোকামি।
ডিমের কুসুম রং এবং ভ্রান্ত ধারনাঃ
ডিমের খোসার ন্যায় ডিমের কুসুমের রং নিয়েও আমাদের মাঝে ভ্রান্ত ধারনা বিদ্যামান। সাধারণত ডিমের কুসুম সাদা, ফ্যাকাসে হলুদ, হালকা হলুদ, স্বাভাবিক হলুদ থেকে গাঢ় হলুদ পর্যন্ত হতে পারে। ভোক্তা হিসেবে অনেকেই মনে করেন, ডিমের কুসুম যদি হলুদ হয়, তাহলে পুষ্টিমাণ বেশি। আর যদি কুসুমের রং হালকা হলুদ বা সাদাটে হয়, তাহলে তার পুষ্টিগুণ কম। এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণাগুলো মোটেই সত্য নয়। কারণ, ডিমের কুসুমের রং যাই হোক না কেন, এর সঙ্গে পুষ্টিগুণের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ, ডিমের কুসুমের রং নির্ভর করে হাঁস-মুরগির খাদ্যের ভেতরে জ্যান্থোফিল নামক একধরনের পিগমেন্ট বা রঞ্জক পদার্থের উপস্থিতির ওপর। হলুদ ভুট্টা, সবুজ শাক-সবজি, ঘাস, লাতা-পাতা, জলজ উদ্ভিদে ডাকউইড, অ্যাজোলা, স্পিরুলিনা ইত্যাদির ভেতরে জ্যান্থোফিল নামক রঞ্জক পদার্থ থাকে। এখানে জানার বিষয় হচ্ছে বিজ্ঞানীদের মতে এই জ্যান্থোফিল নামক রঞ্জক পদার্থের কোন পুষ্টিমান নেই।আমাদের দেশে গ্রাম অঞ্চলের হাঁস-মুরগি নদী-নালা, খাল-বিল বা পুকুর ও ডোবায় চরে বেড়ানোর সময় পর্যাপ্ত রঙ্গিন শাকসবজি, লতা পাতা ও জলজ উদ্ভিদ গ্রহণ করে, ফলে এদের ডিমের কুসুম প্রায়ই গাঢ় হলুদ হয়।মার্কিন গবেষকদের মতে, দু’টি কারণে কুসুমের রং গাড় হতে পারে। এক- মুরগিটি খোলা জায়গায় যত বেশি ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক খাবার থেকে পুষ্টি আহরণ করছে অথবা তাকে বিশেষ ধরনের খাবার খাওয়ানো হচ্ছে কিন্তু তাতে কুসুমের খাদ্যগুণ বা পুষ্টিগুণে খুব একটা পার্থক্য হয় না।
ফার্মের মুরগির চেয়ে দেশি মুরগির ডিম বেশি পুষ্টিকরঃ
আমাদের সমাজে প্রচলিত এবং অনেক শিক্ষিত জনের মাঝে এ ধারণা বদ্ধমূল যে ফার্মের মুরগির চেয়ে দেশি মুরগির ডিম বেশি পুষ্টিকর। অথচ এটা মোটেই সঠিক ধারণা নয়। বিজ্ঞান ও গবেষনা দ্বারা এটাই প্রমাণিত যে দেশি মুরগির ডিম ও ফার্মের মুরগির ডিমের মধ্যে পুষ্টিমাণের মৌলিক কোনো তফাত নেই। এটা দেখা যায় যে দেশি মুরগির ডিমের গড় ওজন প্রায় ৩৫-৩৮ গ্রাম, আর ফার্মের মুরগির ডিমের গড় ওজন প্রায় ৫৮-৬০ গ্রাম। সুতরাং প্রতিটি ডিমের ওজন বিবেচনায় ফার্মের মুরগির ডিমের ওজন দেশি মুরগির ডিমের ওজনের প্রায় দ্বিগুণ। তাই স্বাভাবিক হিসেবে প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান ফার্মের মুরগির ডিমে দেশি মুরগির ডিমের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ বিদ্যমান থাকে। তবে খাবারে বৈচিত্র্য থাকায় এবং খোলা জায়গায় বেশি ঘুরে বেড়ানোর কারণে দেশি মুরগির ডিম স্বাদ ও গন্ধে অসাধারণ হয়।
উর্বর (ফারটাইল) ডিমের পুষ্টিগুণ বেশীঃ
অনেকের মাঝে এ ভ্রান্ত ধারণা আছে যে উর্বর ডিমের পুষ্টিগুণ অনুরবর ডিম অপেক্ষা বেশী এবং উর্বর ডিম খওয়া নিরাপদ নয়। বাস্তবে এ ধারণা সত্য নয়। অনেক পুষ্টিবিদের মতে উর্বর ডিমের পুষ্টিগুণ অনুরবর ডিম অপেক্ষা বেশী কিন্তু এর স্বপক্ষে তাঁরা কোন বৈজ্ঞানিক প্রমানই উপস্থাপন করতে পারেননি। তবে এটা সত্য যে উর্বর ডিমের ভিতর উপযুক্ত পরিবেশে যখন ভ্রূণের বৃদ্ধি ঘটে তখন পুষ্টিমানের কিছুটা উন্নয়ন ঘটে। আবার উর্বর ডিমের দামও বেশী এবং এটি দ্রুত পচনশীল।
অরগানিক ডিমের পুষ্টিগুণ বেশী এবং নিরাপদঃ
অনেকেরই ভ্রান্ত ধারণা যে অরগানিক ডিম সাধারণ ডিমের তুলনায় পুষ্টিগুণে অধিকতর সমৃদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এর সত্যতা নেই। যদিও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে অরগানিক ডিমসহ অন্যান্য অরগানিক কৃষিজাত পণ্য ভোক্তার কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কিন্তু আমাদের দেশে এটি একবারেই নতুন ধারণা। এ কথা সত্য যে অরগানিক ডিম ভোক্তার জন্য খুব নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কারণ এ ক্ষেত্রে মুরগীকে যে খাবার খাওয়ানো হয় তা সম্পূর্ণভাবে পেস্টিসাইড, হারবিসাইড, ফাঙ্গিসাইড ইত্যাদির বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কোনোভাবেই এসব ডিম অধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ নয়। যাহোক, অরগানিক ডিম খেতে চাইলে আপনাকে একটু বেশীই খরচ করতে হবে।
ডিমের কোলেস্টেরল ভীতিঃ
সাধারণভাবে হার্ট অ্যাটাক হয়, যখন হার্টের ধমনীর দেওয়ালে কোলেস্টেরল এবং চর্বি জমা হয়ে, ধমনীতে কোলেস্টেরল জমাট বাঁধার কারণে হার্টে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়। ডায়াবেটিস এবং রক্তচাপের মতো আরও বেশ কয়েকটি ঝুঁকির কারণ রয়েছে, এগুলোও ধমনীতে ব্লকের কারণ হতে পারে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে সত্যিই কি ডিম হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ? এবার দেখা যাক এ ব্যাপারে গবেষনা এবং বিজ্ঞানীদের কী মতামত। আমাদের দরকারি সব কোলেস্টেরল আমাদের দেহেই যকৃতে তৈরি হয়।
সুতরাং একজন ব্যক্তির কোলেস্টেরল প্রোফাইল কী হবে তা নির্ভর করে তিনি কী পরিমান কোলেস্টেরল যুক্ত খাবার খাচ্ছেন এবং তাঁর দেহে কি পরিমান কোলেস্টেরল তৈরি হচ্ছে। রক্তের লাইপোপ্রোটিন অণু আমাদের দেহে কোলেস্টেরল বহন এবং স্থানান্তরিত করে। প্রত্যেক মানুষের দেহে এসব লাইপোপ্রোটিনের আলাদা আলাদা ধরণ থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হবে কিনা তা নির্ধারণ করে এ ধরণের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের উপর। কম ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা এলডিএল কোলেস্টেরলকে খারাপ কোলেস্টেরল হিসেবে ধরা হয়-যা কিনা যকৃত থেকে ধমনী এবং কোষে পরিবাহিত হয়। গবেষকরা বলেন যে, এর ফলে রক্তনালীতে কোলেস্টেরল জমা হয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার সম্পৃক্ত চর্বি (স্যাচুরেটেড ফ্যাট ) এর কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে বলে সতর্ক করা হয়। যেসব খাবারে ট্র্যান্স ফ্যাট বা কৃত্রিমভাবে তৈরি চর্বি থাকে, সেগুলোতেই বেশি পরিমাণে এলডিএল থাকে।
ডিমে যথেষ্ট পরিমানে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে যা কোলেস্টেরলকে অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে জারিত হওয়া প্রতিরোধ করে। আর এ কারণেই ডিমের কোলেস্টেরল স্বাস্থ্য ঝুঁকি অন্যান্যসাধারণ কোলেস্টেলের স্বাস্থ্য ঝুঁকির চেয়ে অনেক কম। কোলেস্টেরল যখন আমাদের ধমনীতে জারিত হয় তখন এটি আরো বেশি ক্ষতি করে।
"কোলেস্টেরল যখন অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে ভাঙে বা জারিত হয়, তখন এটি প্রদাহ সৃষ্টি করে, আর ডিমে সব ধরণের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে যা একে জারিত হওয়া থেকে রক্ষা করে," – বলেন বিজ্ঞানী ব্লেসো। এছাড়া, কিছু কিছু কোলেস্টেরল আমাদের জন্য ভালো। উচ্চ ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা এইচডিএল কোলেস্টেরল যকৃতে পরিবাহিত হয়, যেখানে এটি ভেঙ্গে যায় এবং শরীর থেকে নির্গত হয়। ধারণা করা হয় যে, এইচডিএল রক্তে কোলেস্টেরল জমতে দেয় না বিধায় এটি হৃদরোগ প্রতিরোধে প্রভাব রাখে।
ডিমে যথেষ্ট পরিমানে কোলিন থাকে যা যকৃত ভালো রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। আবার লিউটিনের সবচেয়ে ভালো উৎস হচ্ছে ডিমের কুসুম। চোখে দেখা এবং চোখের রোগ নিয়ন্ত্রণের সাথে লিউটিন সম্পর্কিত। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৩ সালের এক প্রতিবেদনে ডিমের কোলেস্টেরোলের সঙ্গে হৃদ্রোগের কোনো সর্ম্পক নেই উল্লেখ করে প্রতিদিন কমপক্ষে একটি করে ডিম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সুতরাং মানুষের এ ধারণাটিও সঠিক নয়। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, একজন স্বাস্থ্যবান লোকের জন্য ডিম কখনই হৃদরোগের ঝুঁকির কারন নয়।
নকল ডিমের ভ্রান্ত ধারনাঃ
মাঝে মাঝেই শুনি বাজারে নকল ডিম আসছে-আসলে কী তাই! নকল ডিম বলতে এখানে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ডিমকে বোঝানো হয়েছে; যা সাধারণ মানুষ প্লাস্টিকের ডিম বলে জানে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রায়ই নকল বা কৃত্রিম ডিমের বিষয়ে খবর ছাপা হচ্ছে। বাংলাদেশের বাজারে এই কৃত্রিম ডিমের অস্তিত্ব রয়েছে বলে অনেকেই প্রচারও করছেন। ডিমগুলো যদি সত্যি নকল হয় তবে সেটি সত্যিই উদ্বেগের বিষয়। তবে নস্ট ডিম আর নকল ডিম এক জিনিস নয়। অনেকের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে নস্ট ডিম বা বায়োলজিক্যাল ডিফেক্টেড ডিমকে নকল ডিম বলে চিহ্নিত করে থাকেন। এমন কী অনেক বিক্রেতা ডিম কিনে রাখার সময় ডিমের কুসুম বা সাদা অংশের বর্ণ দেখে আসল কিংবা নকল ডিম চেনার অপচেষ্টা করেন। গবেষণাগারে বিভিন্ন রাসায়নিকের সংমিশ্রণে নকল ডিম তৈরি করা সম্ভব কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে তা কখনই লাভজনক নয়। তবে বাস্তব সত্য এটিই যে, বাংলাদেশে কোনো নকল ডিমের অস্তিত্ব নেই।
কচ্ছপের ডিমঃ
ডিম নিয়ে ভোক্তাদের মাঝে অদ্ভূত সব ভ্রান্ত ধরনা বিরাজমান। অনেকেই মনে করেন বাজারে কচ্ছপের ডিমকে মুরগীর ডিম হিসেবে বিক্রি করা হয়। এ কারণে অনেকে সাদা খোসার ডিম পরিহার করেন। তাঁদের ধারণা এ ধরণের ডিম ভারত থেকে আসে। অথচ ব্যাপারটা মোটে ও সঠিক নয়- কারণ বর্তমানে ডিম উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ আর কচ্ছপের এত বিপুল সংখ্যক ডিম কী আদৌ সংগ্রহ করা সম্ভব! প্রকৃত পক্ষে এ ধরণের গুজব আমাদের পোল্ট্রি শিল্পের ধ্বংসের জন্য মারাত্নক হুমকি স্বরূপ।
কাঁচা ডিমে্র পুষ্টিগুন বেশিঃ
আমাদের অনেকে মনে করেন, রান্না করা ডিমের তুলনায় কাঁচা ডিমের পুষ্টিগুন বেশি তাই হরহামেশাই কাঁচা ডিম খেয়ে থাকেন। কিন্তু এর কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই কোনভাবেই কাঁচা ডিম খাওয়ার অভ্যাস করা যাবেনা। কারন কাঁচা ডিম খেলে সালমোনেলা-জাতীয় ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া ডিমের সাদা অংশে অ্যাভিডিন, অভোমিউকয়েড এবং অভোইনহিবিটর নামক এন্ট্রিনিউট্রিশনাল ফ্যাক্টর থাকে যা শুধুমাত্র অধিক তাপে রান্না করে পরিশোধিত করা যায়। সুতরাং কাঁচা ডিম খাওয়ার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই।
ডিম ও দুধ একসঙ্গে খাওয়া ঠিক নয়ঃ
এটা একধরনের ভ্রান্ত ধারণা ও গুজব- যার বিজ্ঞান সম্মত কোন ব্যাখা নেই। ডিম এবং দুধ, দু’টোই প্রোটিনের আদর্শ উৎস। তবে ডিমের মধ্যে প্রোটিন ছাড়াও থাকে অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও আয়োডিন। অপরদিকে দুধে রয়েছে ক্যালসিয়াম, যা দেহের বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। তাই সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে এক গ্লাস দুধ প্রোটিনের পাশাপাশি অন্যান্য দরকারি পুষ্টি উপাদানগুলোর চমৎকার সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। তাই ডিম ও দুধ একসঙ্গে খেতে কোনোই সমস্যা দেখেন না বিশেষজ্ঞরা।
ডিম খেয়ে পরীক্ষার হলে গেলে শূন্য পাবেঃ
কমবেশি আমরা সবাই এ ভ্রান্ত ধারণা ও গুজবের সাথে পরিচিত যে ডিম খেয়ে পরীক্ষার হলে গেলে পরীক্ষা খারাপ হবে, শূন্য পাবে। এমনকি আজকের এই ডিজিটাল সময়ে ও এ রকম ধারনা রয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে। পরীক্ষা দেওয়ার আগে ডিম খাওয়া নিয়ে এমনই একটি মিথ বা কুসংস্কার যুগ যুগ ধরে প্রচলিত যা আমরা আমাদের বড়দের, নানী-দাদীদের নিকট থেকে শুনে আসতেছি। যদিও ডিম খাওয়ার ফলেই পরীক্ষায় ফেইল করেছে এমন কোন চাক্ষুস, বৈজ্ঞানিক কিংবা ঐতিহাসিক তথ্য প্রমান, কেউ পেয়েছেন বলে ও শুনিনি। অথচ গবেষণায় দেখা যায় ডিমের কোলিন (choline) ব্রেইন ও নার্ভের কার্যকলাপ সক্রিয় রাখে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে পুষ্টি যাতায়াত ব্যবস্থাকে তরান্বিত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
উপসংহারঃ
শিক্ষিত অশিক্ষিত সব ধরনের মানুষের ভেতর যুগ যুগ ধরেই কিছু কুসংস্কার ছিল এবং এখনো আছে, বিশেষ করে ডিম নিয়ে সমাজে আরো অনেক ধরনের নেতিবাচক ধারনা এবং কুসংস্কার আছে। এমনকি শিক্ষিত ভদ্রলোকদের মাঝেও ব্যাপারটি লক্ষণীয়। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এগুলো মাঝে মাঝেই ভাইরাল হয়।ডিম খেলে মোটা হয়ে যাবো, হৃদরোগ হবে, কোলেস্টরল বেড়ে যাবে এ ধরনের ভুল ধারনা অশিক্ষিতের চেয়ে আমাদের এক শ্রেণীর শিক্ষিত এলিটদের মধ্যে বরং একটু বেশিই আছে। এসব নেতিবাচক ধারনা ও কুসংস্কার দূর করার জন্য সবার আগে দরকার ডিম সম্পর্কে সচেতনতা।এ ক্ষেত্রে সমাজের সর্বস্তরের জনগণের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই আসুন এই বিশ্ব ডিম দিবসে সবাই ব্রতী হই- নিজেরা বেশি করে ডিম খাব, অন্যকে উতসাহিত করবো এবং সুস্থ্য জাতী গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখব।
লেখকঃ ডঃ মোঃ শরিফুল ইসলাম, গবেষক ও অধ্যাপক, ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫।
মোবাইলঃ ০১৭৮০৬৯১৫৬০
Emali:msips06@ru.ac.bd
